কণকচূড়ার রান্নাঘর
সেই শনিবার থেকে ঝমঝম, টাপুর টুপুর শুরু হয়েছে। এ যেন আকাশের কোণে বসে কেউ নিরবচ্ছিন্ন ভাওলিন বাজিয়ে যাচ্ছে। কণকচূড়ার পিছু পিছু চলেছে কবিতারা। এ কি বিলাসিতা? নাকি প্রেম! তখনি যেন কেউ জানতে চাইলো, "ভালো আছো?"
"ভালো আছো?
-দেখো মেঘ, বৃষ্টি আসবে?
-ভালো আছো?
-দেখো ঈশান কোণের কালো, শুনতে পাচ্ছো ঝড়?
-ভালো আছো?
-এই মাত্র চমকে উঠলো ধবধবে বিদ্যুৎ।
-ভালো আছো?
তার পরেই মনে পড়ে যায় -
"বৃষ্টি নামলো যখন আমি উঠোন-পানে একা
দৌড়ে গিয়ে ভেবেছিলাম তোমার পাবো দেখা
হয়তো মেঘে-বৃষ্টিতে বা শিউলিগাছের তলে
আজানুকেশ ভিজিয়ে নিচ্ছো আকাশ-ছেঁচা জলে
কিন্তু তুমি নেই বাহিরে- অন্তরে মেঘ করে
ভারি ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরে!"
সম্বিত ফিরলে কনকচূড়া রান্নাঘরের জানলা থেকে এসে চুলার সামনে দাঁড়ায়। সংসারের কূট কাঁচালি ভালো লাগেনা তার। সে তো তার আজন্মকালের পাগলামি নিয়ে পাহাড়ি ঝোরার মত উদ্দাম। এত জটিলতা তার পোষায়! এইবার রান্না না চাপালেই নয় যে, মনে হতেই গোবিন্দভোগের চাল আর ভাজা সোনা মুগ ধুয়ে তোলে সে। কড়ায় তেল আর ঘি তে গরম মশলা, শুকনো লঙ্কা, জিরে ফোড়নের সুগন্ধ বেরলেই চাল ডাল দিয়ে নাড়তে থাকে সে। চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত একান্তই তারই ছিল, সংসার করতে ইচ্ছে হত খুব,রান্না করে প্রিয়জনদের সামনে খাবার বেড়ে দিয়ে খুব তৃপ্তি পায় কনকচূড়া। রান্নাঘর টা তার বড় প্রিয় তাই। চাল ডালের সংসারে এবার রোম্যান্টিক প্রেমিকের মত আদা জিরে লঙ্কা হলুদ টমেটোর মিশ্রন মিশিয়ে গুনগুন করতে থাকে আপনমনেই " এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়,এমন দিনে মন খোলা যায়"। এক ছুটে তারপর শোবার ঘরে গিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন বরের মুখখানা দেখে ঠোঁটের কোনে দুষ্টুমি খেলে যায় তার। এমন কত শত দুষ্টুমির ফন্দি নিয়ে এতদিন সে কবিতা লিখেছে। এইটুকুতে খিচুড়ি পোড়া লাগলে লাগুক! পাশের আভেনে জল গরম বসানো, মশলা মাখা চাল ডালের মিশ্রণ জলে দিয়ে দেয় সে। স্বাদ মতো নুন দিয়ে সেদ্ধ হতে দেয়, তারপর কাজু বাদাম, কিসমিস মেশায়।একটু চিনি দিয়ে আর ঘি ছড়িয়ে নামিয়ে ফেলে। মা ভোগের খিচুড়ি করলে সবসময় কাঠখোলায় ভেজে রাখা গুঁড়ো মশলা ছড়িয়ে দিতো,ভারী সুন্দর গন্ধ তার! কনক ও আজ তাই করে। সাথে তেল মাখানো পাঁপড় সেঁকে নেয়, অমলেট বানায় আর গতকালের ডাঁটাপোস্ত গরম করে নিয়ে দু কাপ কফি বানিয়ে ঘরে এসে " কি রে ওঠ না, স্নানে যাবিনা! ওঠ বলছি! "
Comments
Post a Comment